
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সম্ভাব্য ঝুঁকি ও এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিনিয়ত দীর্ঘ সংলাপে ব্যস্ত, ঠিক তখনই এক নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করল প্রবীণ নীতিনির্ধারকদের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট একদল শিক্ষার্থী। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চ ও বড় বড় কর্পোরেট বোর্ডের বয়োবৃদ্ধ পরিচালকেরা যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তা অনায়াসে করে দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একদল দূরদর্শী কিশোর-কিশোরী। স্কুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে তারা তৈরি করেছে এক যুগান্তকারী খসড়া আইন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্টুডেন্টস ফার্স্ট অ্যাক্ট’ (Students First Act)।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০টি ভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আসা ৯৮ জন মেধাবী তরুণ-তরুণী এই ঐতিহাসিক খসড়া নীতিমালা প্রণয়নে অংশ নেয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে শিক্ষার্থীদের এই প্রস্তাবিত আইনটি ৮২-১৬ ভোটের বিপুল ব্যবধানে পাস হয়। এই আইন পাসের মাধ্যমে বিশ্বকে তরুণ প্রজন্ম একটি স্পষ্ট বার্তা দিল—প্রযুক্তিকে ভয় পেয়ে বন্ধ করার চেয়ে সঠিক নিয়মের অধীনে এনে শিক্ষা ব্যবস্থায় কাজে লাগানোই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি কিংবা গুগলের জেমিনাই-এর মতো শক্তিশালী এআই টুলগুলো সাধারণ মানুষের নাগালে আসার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থা এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ক্লাসরুমে হোমওয়ার্ক তৈরি, অ্যাসাইনমেন্ট লেখা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এআই-এর অপব্যবহার নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। তবে এই প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন না শিক্ষার্থীরা। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের অনেক সরকার এআই নীতি প্রণয়ন করতে গিয়ে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বছরের পর বছর সময় পার করলেও, শিক্ষার্থীরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে এর একটি কার্যকারী সমাধান বের করেছে।
‘স্টুডেন্টস ফার্স্ট অ্যাক্ট’-এর মূল বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধাকে গ্রহণ করার পাশাপাশি এর অপব্যবহার রোধে বেশ কিছু কঠোর ও বাস্তবমুখী প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা (Data Privacy), প্রাতিষ্ঠানিক সততা রক্ষা এবং এআই-ভিত্তিক টুলের ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, শিক্ষকরা যাতে ক্লাসরুমে এআই ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন এবং প্রযুক্তির কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নীতিপ্রণেতা বা রাজনীতিবিদদের চেয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমের বাস্তব অভিজ্ঞতা খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের তৈরি নীতিতে যেখানে প্রায়শই প্রযুক্তির প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা অতিরিক্ত কঠোরতা দেখা যায়, সেখানে শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা। এটি একদিকে যেমন মেধার বিকাশ ও স্বাধীন চিন্তাকে উৎসাহিত করে, অন্যদিকে এআই-কে কেবল একটি ‘সহায়ক মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দেয়, যেন তা মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তিকে প্রতিস্থাপিত করতে না পারে।
এই ঘটনাটি কেবল আমেরিকার প্রেক্ষাপটেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত শিক্ষণীয়। আমাদের দেশেও যখন ক্লাসরুমে ডিজিটাল মাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনুপ্রবেশ ঘটছে, তখন প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে শুধু সমালোচনা না করে এভাবে যুগোপযোগী নীতিমালা তৈরি করা সময়ের দাবি। কিশোরদের তৈরি এই ‘স্টুডেন্টস ফার্স্ট অ্যাক্ট’ প্রমাণ করে দিল যে, নতুন যুগের প্রযুক্তিকে সামলাতে নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবনী চিন্তার বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।
0 Comments