গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান প্রকাশ্যেই একটি শক্তিশালী মুসলিম জোট গঠনের আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। আঙ্কারার লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা নির্যাতন বন্ধে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা এবং যৌথ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। তুরস্কের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেললেও, পর্দার আড়ালে সবচেয়ে চতুর ও দূরদর্শী চালটি চেলেছেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স তথা দেশটির ডি ফ্যাক্টো শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। তিনি উচ্চকণ্ঠ হুঙ্কার না দিয়ে, ঠাণ্ডা মাথায় এক সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছেন গোটা বিশ্বকে।
মোহাম্মদ বিন সালমানের এই নতুন কৌশলের মূল সারমর্ম হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক অবস্থান তৈরি করা। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে, সৌদি আরব এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করেছে যেখানে সসংঘাতের দু'পক্ষই তাদের নিজেদের জন্য কিছু না কিছু সমন্বয় বা সহমর্মিতার সুযোগ খুঁজে পায়। একদিকে রিয়াদ ওয়াশিংটনের সাথে নিজেদের নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা বজায় রেখেছে, অন্যদিকে তেহরানের সাথে সম্পর্কের বরফ গলানোর প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত করেছে। একই সাথে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছাড়া ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করার সিদ্ধান্তে অটল থেকেছে রিয়াদ। সৌদি আরবের এই প্রজ্ঞাপূর্ণ অবস্থানই কার্যত তথাকথিত 'মক্কা চুক্তি' বা 'সৌদি কেন্দ্রিক মুসলিম ঐক্যের' জন্ম দিয়েছে, যা ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যৌথ মাস্টারপ্ল্যানকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত 'আব্রাহাম অ্যাকোর্ডস'-এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েল যেভাবে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছিল, সৌদি আরবের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ তার জন্য এক বড় ধাক্কা। আবুধাবি চেয়েছিল পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে এক নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অক্ষ তৈরি করতে, যেখানে ইরানের প্রভাবকে পুরোপুরি রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু সৌদি আরব এই খেলায় যুক্ত না হয়ে বরং তেহরানের সাথে কূটনৈতিক পথ খোলা রাখা এবং তুরস্কের মুসলিম জোটের প্রস্তাবকে কৌশলে নিজেদের নেতৃত্বের অধীনে নিয়ে আসায় আমিরাতের সেই একক প্রভাব বিস্তারের স্বপ্ন বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মূল রাজনৈতিক কৌশল ছিল—ফিলিস্তিন সংকটকে একপাশে সরিয়ে রেখে সৌদি আরবের সাথে ঐতিহাসিক চুক্তি সই করা। যদি রিয়াদ এই চুক্তিতে সায় দিত, তবে গোটা মুসলিম বিশ্বে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা একধাক্কায় বহু গুণে বেড়ে যেত। কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে নেতানিয়াহুর সেই হিসাব একেবারেই ওলটপালট হয়ে গেছে। গাজায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পর রিয়াদ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া তেল আবিবের সাথে সম্পর্কের কোনো সুযোগ নেই। ফলে, মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একঘরে হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য ইসরায়েল যে ছক কষেছিল, তা এখন উল্টে গিয়ে উল্টো ইসরায়েলকেই কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলছে।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্যও এটি একটি বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার এবং সৌদি আরবের একক প্রভাব হ্রাস করার লক্ষ্যে আবুধাবি যে কৌশল গ্রহণ করেছিল, তা এখন সংকটে। একদিকে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের কারণে নিজেদের দেশের অভ্যন্তরে ও আরব বিশ্বে প্রচণ্ড জনরোষের মুখে পড়তে হচ্ছে আমিরাতকে, অন্যদিকে সৌদি আরবের এই সর্বদলীয় কূটনৈতিক অবস্থান আমিরাতকে আঞ্চলিক রাজনীতির মূলধারায় কিছুটা একা করে দিচ্ছে। আমিরাত-ইসরায়েল জোটটি যে উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল, আঞ্চলিক এই নতুন মেরুকরণের ফলে তার কার্যকারিতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের এই পদক্ষেপ কেবল গাজা যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশল। ইরান যখন ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি বাহিনীর শক্তিতে বলীয়ান এবং ইসরায়েল যখন চরমপন্থা ও সামরিক আগ্রাসনের পথ বেছে নিয়েছে, তখন সৌদি আরব নিজেদের 'ইসলামী বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু' হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করছে। 'মক্কা কেন্দ্রিক' এই নতুন কূটনৈতিক শক্তি কেবল পশ্চিমা কিংবা ইসরায়েলি এজেন্ডা বাস্তবায়ন মেনে নেবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় রিয়াদ নিজেই এখন প্রধান চালকের আসনে বসেছে।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যে যৌথ স্বার্থ গড়ে উঠেছিল, তা এখন মারাত্মক এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবিত মুসলিম জোট গঠনের তাগিদ এবং সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের ভারসাম্যপূর্ণ ও চতুর কূটনৈতিক নীতি মিলে তেল আবিব ও আবুধাবির রাজনৈতিক সমীকরণকে অকার্যকর করে দিচ্ছে। আগামী দিনে এই আঞ্চলিক মেরুকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে গাজা পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি এবং রিয়াদের কৌশলগত দূরদর্শিতার ওপর। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এখন আর একক কোনো পশ্চিমা বা ইসরায়েলি এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।

0 Comments