বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ইতোমধ্যেই ছয়টি মাস পার হয়ে গেছে। যেকোনো নতুন সরকারের মেয়াদের প্রথম ছয় মাসকে তাদের নীতিনির্ধারণ, কর্মপরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার একটি প্রাথমিক পরীক্ষার সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার জায়গা ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি এবং মনে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনা। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারের এই ছয় মাসের মেয়াদে আইনশৃঙ্খলা খাতে উল্লেখ করার মতো কোনো স্বস্তিদায়ক পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিভিন্ন স্তরের অপরাধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই এবং সামাজিক অপরাধের কারণে নাগরিক জীবনে এক ধরনের উদ্বেগ ও অস্বস্তি বজায় রয়েছে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গভীর রাতে অথবা ভোরের দিকে সাধারণ পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন। নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল বহনকারী পরিবহন থেকে শুরু করে সাধারণ রিকশার যাত্রী—সবাই কোনো না কোনোভাবে এক অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল ও টহল চৌকি থাকা সত্ত্বেও অপরাধীরা নিজেদের কৌশল বদলে নিত্যনতুন অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, যা প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বা 'মব জাস্টিস' সম্প্রতি এক বড় সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, সাধারণ জনতা অপরাধের সন্দেহে বা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষকে গণপিটুনি দিচ্ছে, যা কোনো গণতান্ত্রিক ও আইন শাসিত সমাজে অত্যন্ত বিপজ্জনক ইঙ্গিত বহন করে। এই ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করতে প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো বড় সাফল্য দেখাতে পারেনি। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারের আইনি কাঠামোর ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অবিশ্বাসের এক ধরনের মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া, চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক অপরাধ নতুন আঙ্গিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দেশের পরিবহন খাত, কাঁচাবাজার ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পূর্বে বিদ্যমান চাঁদাবাজির রুটগুলো হাতবদল হলেও পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। ফলস্বরূপ, পণ্যের চড়া দামের জন্য যেমন একদিকে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যেখানে পূর্বশর্ত ছিল, সেখানে ছয় মাসেও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে স্বস্তি না আসা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও তাদের মানসিক বল ফিরিয়ে আনা ছিল এই সরকারের সামনে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। বিগত সময়ে পুলিশের বিভিন্ন স্তরে যে প্রশাসনিক রেশাফলিং বা রদবদল করা হয়েছে, তার সুফল এখনো পুরোপুরি মাঠ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কার্যক্ষমতা এবং দায়িত্ব পালনে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক স্থানে পুলিশ নিজেদের আইনি ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করছে, যার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে অপরাধী চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ জনগণের মধ্যে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কোন্দলও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় রাজনীতিভিত্তিক সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং পেশিশক্তির ব্যবহার থমকে থাকেনি। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে যে সহিংস পরিবেশ তৈরি হয়, তা নিয়ন্ত্রণে কঠোর না হলে কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অপরাধীদের কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে যদি কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই ধরনের সংঘাত বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
বিশেষ করে নারী নিরাপত্তা ও সাইবার জগতের অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গণপরিবহন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক মাধ্যমে নারীরা নিয়মিত হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, সাইবার বুলিং ও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ধরনের গুজব দেশের স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে, যার কার্যকর সমাধানে সরকারের গোয়েন্দা ও সাইবার নিরাপত্তা শাখার আরও শক্ত ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন ছিল।
যদিও সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে যে অপরাধীদের দমনে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান ও চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সাময়িক অভিযান মাঠ পর্যায়ের সার্বিক চিত্রে বড় কোনো স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারছে না। কৌশলগত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণেই অপরাধপ্রবণতা কমছে না।
চূড়ান্ত পর্যালোচনায় বলা যায়, একটি দেশের স্থিতিশীলতা এবং সরকারের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে কতটুকু শান্তিতে ও নিরাপদে দেশের নাগরিকরা বসবাস করছেন তার ওপর। সরকারের বিগত ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের পর এখন সময় এসেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জোরদারে বাস্তবমুখী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের। পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সাথে পুনর্গঠন, দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা, এবং সাধারণ মানুষের সাথে প্রশাসনের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই পারে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জমে থাকা অসন্তোষ ও নিরাপত্তাহীনতা আগামী দিনে প্রশাসনের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।
0 Comments