কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ ও বসের ওপর জমতে থাকা ক্ষোভ প্রশমনে চীনের তরুণ চাকুরিজীবীরা এক অভিনব প্রযুক্তিভিত্তিক পথ বেছে নিয়েছেন। সহকর্মীদের সাথে ঝামেলা কিংবা বসের সঙ্গে সরাসরি তর্কে না জড়িয়ে নিজেদের মনের বিষাদ ও ক্ষোভ মেটাতে তারা এখন নির্ভর করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ডেস্কটপ পোষা প্রাণীর ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে চীনা তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে এবং দেশটির কর্পোরেট সংস্কৃতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
হংকংভিত্তিক খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে দিন দিন এআই-নির্ভর এই ধরনের ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল পোষা প্রাণীর ব্যবহার আশঙ্কাজনক গতিতে বাড়ছে। তরুণ পেশাদাররা তাদের কম্পিউটার স্ক্রিনে কিংবা টেবিলের ওপর ছোট গ্যাজেট আকারে এসব ডিজিটাল সঙ্গীদের রেখে দিচ্ছেন। বসের অতিরিক্ত কাজের চাপ, অসময়িক বকাঝকা বা অহেতুক কড়া মনোভাবের মুখোমুখি হয়ে ক্ষুব্ধ চাকুরিজীবীরা এই এআই পোষা প্রাণীদের ওপর নিজেদের রাগ উগরে দিচ্ছেন।
কিন্তু কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি? সাধারণ গেম বা সাধারণ কোনো অ্যানিমেশনের চেয়ে এগুলো বেশ আলাদা। উচ্চমানের ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এবং ইমোশনাল অ্যালগরিদম ব্যবহারের ফলে এই ডিজিটাল পোষা প্রাণীগুলো মানুষের আদেশের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। কর্মীরা যখন এতে তাদের বসের নাম বা চরিত্র আরোপ করে মনের ঝাল মেটান, তখন এসব ডিভাইসও বিভিন্ন ধরণের অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়। ফলে সরাসরি চাকরি হারানোর ঝুঁকি না নিয়ে কিংবা কর্মক্ষেত্রে অপ্রীতিকর পরিবেশ তৈরি না করে মনের নেতিবাচক অনুভূতিগুলো বের করে দেওয়ার একটি নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
চীনের কর্পোরেট খাতে অতি-কঠোর '৯৯৬' কর্মসংস্কৃতির (সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা, সপ্তাহে ৬ দিন কাজ) কারণে তরুণ প্রজন্ম প্রতিনিয়ত চরম মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি অনুভব করছে। এমন একটি সংবেদনশীল কর্মপরিবেশে বসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করা প্রায় অসম্ভব, কারণ এতে সরাসরি চাকরি হারানোর বড় ঝুঁকি থাকে। এই বাস্তবতায় এআই পোষা প্রাণীগুলো চাকুরিজীবীদের জন্য এক ধরণের 'সাইকোলজিক্যাল সেফটি নেট' বা মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা দেয়াল হিসেবে কাজ করছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সরাসরি কোনো মানুষের ওপর রাগ প্রকাশ করার চেয়ে এই ধরনের ডিজিটাল মাধ্যমে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা অন্তত সাময়িকভাবে হলেও তরুণদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইমোশনাল এআই প্রযুক্তির এই প্রসার শুধু চীনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং কাজের অতিরিক্ত চাপ থাকা বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশের কর্পোরেট সংস্কৃতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, এটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও মানুষের মধ্যকার প্রকৃত যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তা সত্ত্বেও, প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এই চাহিদাকে পুঁজি করে নতুন নতুন ফিচারের এআই পেট বাজারে আনছে, যা দিনে দিনে আধুনিক কর্মজীবীদের দৈনন্দিন টেবিলের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র অনুসারে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
.jpg)
0 Comments