Header Ads Widget

Put AdSense Code Here

ফেনীর আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলা: ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় আজ, সোনাগাজীতে কড়া নিরাপত্তা

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন
সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করা ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রফি হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ) ও আপিলের রায় ঘোষণা করা হচ্ছে আজ। হাইকোর্টের বিচারিক বেঞ্চ থেকে আসতে যাওয়া এই ঐতিহাসিক রায়ের দিকে দেশবাসীর গভীর নজর রয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং উভয় পক্ষের শুনানি শেষে উচ্চ আদালত আজ এই মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে যাচ্ছেন। রায়কে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে এবং নুসরাতদের গ্রামীণ বাড়িতে নিরাপত্তাবেষ্টনী উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে।



আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯ সালে নৃসংসবাবে নুসরাতকে হত্যার পর থেকেই ফেনীর সোনাগাজীতে তাঁদের বাড়িতে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও সুরক্ষার অংশ হিসেবে দুইজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন। তবে হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার দিনক্ষণ নির্ধারণের পর থেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকি ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পুলিশ প্রশাসন বাড়তি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রবিবার (পরশু) থেকে নুসরাতের বাড়িতে অতিরিক্ত আরও ৭ জন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে মোট ৯ জন পুলিশ সদস্য দিনরাত ওই বাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্ব পালন করছেন। সোনাগাজী থানা প্রশাসন জানিয়েছে, বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়া এবং সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকা পর্যন্ত এই কড়া নজরদারি বজায় থাকবে।

নুসরাত জাহান রফির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস বাংলাদেশের নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানি বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা করেছিলেন নুসরাত। মামলাটি তুলে নিতে তাঁর ওপর একাধিকবার চাপ সৃষ্টি করা হলেও নুসরাত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেন। এর জেরে ওই বছরের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা চলাকালীন তাকে কৌশলে মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বোরকা পরা একদল ঘাতক তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে ফেনী সদর হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হলেও ১০ এপ্রিল রাতে মৃত্যুর কাছে হার মানেন প্রতিবাদী এই তরুণী।

মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও নুসরাত পুলিশের কাছে দেওয়া 'ডাইং ডিক্লেয়ারেশন' বা জবানবন্দিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কথা বলে গিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সবচেয়ে বড় আইনি দলিল হিসেবে কাজ করে। এই হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নির্দেশ দেন এবং মামলাটি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পিবিআই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

পরবর্তীতে বিচারিক আদালতের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে অভিযুক্ত ১৬ জন আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এবং প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। নিম্ন আদালতের বিচারিক ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হওয়া বহুল আলোচিত রায়। আসামিদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম, আবছার উদ্দিন, নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, কামরুন নাহার মনি এবং উম্মে সুলতানা পপি প্রমুখ।

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে তা কার্যকরের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন বা 'ডেথ রেফারেন্স'-এর প্রয়োজন হয়। একই সাথে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও তাঁদের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পান। সেই আইনি ধারাবাহিকতায় নিম্ন আদালতের রায় ঘোষণার পর মামলাটির যাবতীয় নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও নিজেদের নির্দোষ দাবি করে জেল আপিল ও নিয়মিত আপিল দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করে, অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দণ্ড মওকুফ বা কমানোর দাবি জানান।

আজকের এই রায়কে ঘিরে নুসরাতের পরিবার ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও গভীর প্রত্যাশা বিরাজ করছে। নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁরা শুরু থেকেই ন্যায়বিচারের আশায় পথ চেয়ে আছেন। নিম্ন আদালত যেভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, হাইকোর্টও যেন সেই রায় বহাল রাখেন—এটাই তাঁদের একমাত্র প্রার্থনা। নুসরাতের ভাইদের মতে, এই রায় কেবল তাঁদের পরিবারের জন্য নয়, বরং দেশের সমগ্র নারী সমাজের সুরক্ষার জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা দিতে উচ্চ আদালতের এই রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন আইন বিশ্লেষকরাও।

আদালত পাড়া থেকে শুরু করে সোনাগাজীর প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এখন কেবলই অপেক্ষার প্রহর। নুসরাতের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আইনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা দৃঢ় হয়, আজকের এই চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমেই তা প্রতিফলিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আরটিভি নিউজ (RATV News) এই ঐতিহাসিক রায়ের প্রতি মুহূর্তের হালনাগাদ তথ্য পাঠক ও দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে সোচ্চার রয়েছে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

Post a Comment

0 Comments