Header Ads Widget

Put AdSense Code Here

অভিযুক্ত নিজেই তদন্তকারী হলে অধরাই থাকবে বিচার: প্রস্তাবিত আইন সংশোধন নিয়ে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের কঠোর বার্তা

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব যদি সংশ্লিষ্ট বাহিনীর হাতেই অর্পণ করা হয়, তবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব বলে তীব্র মন্তব্য করেছেন সিনিয়র আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসেকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এটি ন্যায়বিচারের সর্বজনীন ও মৌলিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।


অভিযুক্ত নিজেই তদন্তকারী হলে অধরাই থাকবে বিচার: প্রস্তাবিত আইন সংশোধন নিয়ে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের কঠোর বার্তা

সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনা এবং এই সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইন সংশোধনী নিয়ে বিষদ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাজুল ইসলাম এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তার মতে, আইনের শাসনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো বিচার প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতা। কিন্তু একটি বাহিনীর কোনো সদস্য যদি অন্যায় বা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, আর সেই অপরাধের অনুসন্ধান কিংবা তদন্তের দায়িত্ব যদি ওই বাহিনীরই কোনো অফিসারের ওপর ন্যস্ত করা হয়, তবে সেখানে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।

তাজুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, 'যেখানে অপরাধী বা আসামীর পক্ষ এবং তদন্তকারী সংস্থা একই প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত হয়, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্তের আশা করা ভিত্তিহীন। আইনি প্রবাদে রয়েছে—কোনো ব্যক্তিই নিজের মামলার বিচারক হতে পারে না। প্রস্তাবিত আইনটিতে স্বীয় বাহিনীর অপরাধীদের নিজ বাহিনী দিয়ে তদন্ত করানোর যে বিধান রাখা হচ্ছে, তা এই সার্বজনীন নীতিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে। এর মাধ্যমে বাস্তবে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হবে।'

বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বিশিষ্ট এই আইনজীবী আরও উল্লেখ করেন, অতীতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা বা স্বকীয় তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বড় কোনো অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের নজির খুব একটা দেখা যায়নি। বরং প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম রক্ষার অজুহাতে অনেক সময়ই মূল অভিযুক্তদের আড়াল করার কিংবা অপরাধের মাত্রা লঘু করে দেখানোর প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রের প্রধান সংস্থাগুলোর প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

প্রস্তাবিত এই বিধান সংশোধন না করা হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের মানবাধিকার ও বিচার ব্যবস্থার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা যেকোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম, খুন, নির্যাতন বা যেকোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো বেসামরিক সংস্থা অথবা বিচার বিভাগীয় প্যানেল গঠন করা বাধ্যতামূলক। বিশ্বজুড়ে যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধারণ বেসামরিক আদালতের জবাবদিহিতার আওতায় আনার চর্চা জোরদার হচ্ছে, সেখানে এ ধরনের প্রস্তাবিত আইন দেশের আইনি সংস্কারকে পেছনের দিকে ঠেলে দেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোকে শক্তিশালী করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আইনের ঊর্ধ্বে নন—এই বার্তাটি পরিষ্কারভাবে সমাজে পৌঁছাতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন বা সংস্থা, যা বাহিনীর প্রভাব বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনা করতে পারবে।

আইন সংস্কার প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বর্ণনা করে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা না করে আমজনতার বিচার পাওয়ার অধিকারকে প্রাধান্য দেন। প্রস্তাবিত আইন থেকে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টিকারী বিতর্কিত অনুচ্ছেদগুলো অবিলম্বে বাদ দিয়ে একটি যুগোপযোগী, গ্রহণযোগ্য ও মানবাধিকারবান্ধব আইন প্রণয়নের জোর দাবি জানান তিনি। অন্যথায় দেশের আইনি কাঠামো ভঙ্গুর হয়ে পড়বে এবং ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ আরও ঘনীভূত হবে বলে মনে করেন আইন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

Post a Comment

0 Comments