
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পরিবহনশ্রমিক এবং আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তীব্র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার একপর্যায়ে পরিবহনশ্রমিকেরা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে চড়াও হয় এবং এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের (টিয়ারশেল) শট ছোড়ে পুলিশ। পরবর্তীতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা নগরীর অন্যতম ব্যস্ত সড়ক অবরোধ করলে যান চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়, যার ফলে চরম চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বকেয়া পাওনা, পরিবহন খাতে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি বন্ধ এবং স্থানীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই সংগঠিত হতে থাকেন পরিবহনশ্রমিকেরা। একপর্যায়ে সড়ক দখল করে তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেন। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তুঙ্গে ওঠে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় টহল পুলিশ এবং শ্রমিকদের শান্ত হয়ে সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে পুলিশের এই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আন্দোলনকারীরা।
পুলিশ ও শ্রমিকদের এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা মুহূর্তের মধ্যেই সহিংস রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এবং এলাকাটি মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা রাস্তার পাশ থেকে ইট ও পাথরের টুকরো কুড়িয়ে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ছিটকাতে শুরু করেন। শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি ক্রমেই অনিয়ন্ত্রিত ও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠলে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স অকুস্থলে তলব করা হয়। আন্দোলনকারীদের তছনছ করতে ও সরকারি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ অবস্থান শক্ত করে। আত্মরক্ষা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে কাঁদানে গ্যাসের শট ছোড়ে পুলিশ। টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় পুরো এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে সাধারণ পথচারী ও দোকানদাররা আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দিকবিদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করেন।
পুলিশের শক্ত অবস্থানের কারণে প্রধান পয়েন্ট থেকে শ্রমিকেরা সরে গেলেও, পরবর্তীতে তারা একত্রিত হয়ে নগরের সাথে আন্তঃজেলার সংযোগকারী প্রধান মহাসড়ক অবরোধ করে। দূরপাল্লার বাস ও স্থানীয় মিনিবাস সড়কে আড়াআড়িভাবে দাঁড় করিয়ে রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে নগরের অভ্যন্তরে প্রবেশের সকল পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং শত শত যানবাহন আটকে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
হঠাৎ এমন অবরোধের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন অফিসগামী মানুষ, চাকরিজীবী, স্কুলের শিক্ষার্থী ও চিকিৎসা নিতে বের হওয়া রোগীরা। রাস্তায় যানবাহন না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদ ও গরমে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় হাজার হাজার মানুষকে। জরুরি সেবার গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সও দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে দেখা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত এই জনভোগান্তিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ নাগরিকরা।
ঘটনা প্রসঙ্গে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, "শ্রমিকেরা বেআইনিভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছিল। আমরা অত্যন্ত ধৈর্য ধরে তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু তারা উল্টো পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালায়। পুলিশের ওপর হামলা প্রতিরোধে এবং জনস্বার্থে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিয়ম মেনে টিয়ারশেল প্রয়োগ করা হয়েছে।"
অপরদিকে, পরিবহন শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, পুলিশ কোনো প্রকার উস্কানি ছাড়াই তাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে চড়াও হয়েছে এবং অন্যায়ভাবে চড়াও হয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছে। তাদের দাবি, সাধারণ শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি না মেনে উল্টো কাদানে গ্যাস ছুড়ে হামলা চালানো হয়েছে, যার প্রতিক্রিয়াতেই শ্রমিকেরা প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য হয়েছে।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সে লক্ষ্যে পুলিশ ও র্যাবের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের মধ্যে সমঝোতার আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। সড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, তবে সাধারণ মানুষের মনে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।
0 Comments