নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এখনও ৪০৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ভারতীয় বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে নেপাল পুলিশের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে ৬৪ জনের মরদেহ ভাটির দিকে চিতওয়ান জেলায় পাওয়া গেছে। এছাড়া নওয়ালপরাসি ইস্ট এলাকায় আরও ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এখনও শত শত মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে স্থানীয় প্রশাসন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
কীভাবে শুরু হলো এই আকস্মিক বন্যা?
প্রাথমিকভাবে এই দুর্যোগের কারণ হিসেবে ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথা উঠে এলেও পরে পরিস্থিতি নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, হিমবাহ ধস এবং পাহাড়ি ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত থেকে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
হিমালয় অঞ্চলে থাকা হিমবাহ, বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল অংশ কোনো কারণে ধসে পড়লে তা নদীর গতিপথে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের ধস নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে আশপাশের বসতি, সড়ক, সেতু এবং পর্যটন এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
রাসুয়া অঞ্চলের ভোতেকোশি নদীর আশপাশে এই দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বন্যার প্রবল স্রোতে বহু বাড়িঘর, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কিছু এলাকায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পাহাড়ি এলাকা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক যোগাযোগের কারণে উদ্ধার কার্যক্রমে নানা ধরনের বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।
এত পর্যটক কেন গিয়েছিলেন?
নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চল শুধু ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি দেশটির অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা হিসেবেও পরিচিত। হিমালয়ের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি নদী, ট্রেকিং রুট, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম এবং সীমান্তবর্তী সংস্কৃতি দেখতে প্রতি বছর দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক পর্যটক সেখানে ভ্রমণ করেন।
নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে অনেকেই ভারতীয় হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, সীমান্তবর্তী হওয়ায় ভারত থেকে সড়কপথে সহজে ওই অঞ্চলে যাতায়াত করা যায়। নেপালের পাহাড়ি প্রকৃতি, ধর্মীয় স্থান, ট্রেকিং এবং বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম ভারতীয় পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়।
এছাড়া দুর্যোগকবলিত অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা প্রকৃতিপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটকদের কাছেও পরিচিত। পাহাড়, নদী, বনাঞ্চল এবং ট্রেকিংয়ের সুযোগ থাকায় বছরের বিভিন্ন সময়ে সেখানে পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যায়।
তবে আকস্মিক বন্যার সময় এসব পর্যটকের অনেকেই নদীর আশপাশ, সড়কপথ, হোটেল, রিসোর্ট বা ভ্রমণ রুটে অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হঠাৎ পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে আসায় অনেকের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ কমে যায়।
চিতওয়ানে জারি করা হয়েছে উচ্চ সতর্কতা
বন্যার পানি ভাটির দিকে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে জঙ্গল সাফারির জন্য জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র চিতওয়ান এবং আশপাশের কয়েকটি পৌরসভায় পানির স্তর বাড়তে থাকায় স্থানীয়দের সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে।
চিতওয়ান নেপালের অন্যতম পরিচিত পর্যটন অঞ্চল। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, একশৃঙ্গ গণ্ডারসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী দেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা সেখানে ভ্রমণ করেন। ফলে বন্যার বিস্তার পর্যটন খাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। নদীর পানি আরও বাড়লে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
চলছে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম
দুর্যোগকবলিত এলাকায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সেনা, পুলিশ এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করছে। দুর্গত মানুষের জন্য খাদ্য, পানি ও জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানো হচ্ছে।
এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রায় আট টন ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ও অন্যান্য জরুরি ব্যবস্থার প্রয়োজন হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নেপালের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা
এখনও ৪০৩ জন নিখোঁজ থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উদ্ধারকর্মীরা নদীর ভাটির দিকসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। প্রবল স্রোতে অনেক মানুষ দূরে ভেসে যাওয়ায় তাদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।
হিমালয় অঞ্চলের এই ভয়াবহ দুর্যোগ আবারও পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহ ধস, পাহাড়ি ভূমিধস এবং নদীর গতিপথে আকস্মিক পরিবর্তন হলে অল্প সময়ের মধ্যেই বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
নেপালের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে চলমান উদ্ধার অভিযান এবং নিখোঁজ শত শত মানুষের ভাগ্য এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হলেও উদ্ধারকারী দলগুলো জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
0 Comments