দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনা 'ফোর্সেস গোল ২০৩০'-এর আলোকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে একটি আধুনিক, চৌকস ও ত্রিমাত্রিক বলয় হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই বিশাল পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি সূত্রের তথ্যমতে, দেশের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনে বিমানবাহিনীর জন্য চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এমআরসিএ) সংগ্রহ এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত পুরনো প্রযুক্তির যুদ্ধবিমানগুলোকে পর্যায়ক্রমে অবসরে পাঠিয়ে এই আধুনিক সুপারসনিক যুদ্ধবিমানগুলো প্রতিস্থাপন করা হবে, যা বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষা এবং আকাশসীমার সর্বভৌমত্ব রক্ষায় অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখবে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনা প্রতিরক্ষা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান চেংদু এরোস্পেস কর্পোরেশনের নির্মিত 'জে-১০ সিই' (যা 'ভিগোরাস ড্রাগন' নামেও পরিচিত) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক একক ইঞ্জিনের অল-ওয়েদার যুদ্ধবিমান। এতে রয়েছে সক্রিয় ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যান করা অ্যারে (AESA) রাডার প্রযুক্তি, যা দূরপাল্লার টার্গেট চিহ্নিত করতে এবং নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে অত্যন্ত কার্যকরী। এছাড়া এই বিমানটি পিএল-১৫ (PL-15) সহ বিভিন্ন ধরনের বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ (BVR) বা দৃষ্টিসীমার বাইরের ক্ষেপনাস্ত্রে সজ্জিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে পশ্চিমা দেশগুলোর সমমানের যুদ্ধবিমানের তুলনায় সাশ্রয়ী মূল্য এবং রক্ষণাবেক্ষণের সহজলভ্যতার কারণে জে-১০ সিই বিমানটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চাহিদার সাথে অত্যন্ত মানানসই বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কেবল যুদ্ধবিমানই নয়, আধুনিক যুদ্ধ কৌশলে ড্রোনের গুরুত্ব বিবেচনা করে উন্নতমানের ইউএভি (UAV) সিস্টেম ক্রয়ের প্রক্রিয়াও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এই ড্রোনগুলো কেবল গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যানুসন্ধানের কাজেই ভূমিকা রাখবে না, বরং বিশেষ সামরিক অভিযানে নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতেও সক্ষম হবে। একই সাথে পার্বত্য এলাকা এবং দুর্গম সীমান্তে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও স্থলবাহিনীকে আকাশ থেকে সামরিক সহায়তা (ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট) দেওয়ার জন্য এয়ারফোর্সে যুক্ত হচ্ছে অ্যাটাক হেলিকপ্টার। এই অ্যাটাক হেলিকপ্টারগুলো দেশের কৌশলগত প্রতিরক্ষা কাঠামকে বহুগুণ শক্তিশালী করবে।
এছাড়া রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের নিরাপদ যাতায়াত, কূটনৈতিক মিশন এবং উদ্ধার অভিযানে গতি আনতে কেনা হচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ভিআইপি হেলিকপ্টার। এটি বিমানবাহিনীর পরিবহন ও জরুরি কার্যক্রমে আরও বেশি সমন্বয় তৈরি করবে। বিভিন্ন সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বিমানবাহিনী যে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে আসছে, নতুন এই সরঞ্জামগুলো যুক্ত হলে সেই সক্ষমতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় একটি দেশের আকাশসীমার অভেদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। চীন থেকে এসব উন্নত প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কৌশলকে বহুলাংশে ত্বরান্বিত করবে। এটি কেবল বিমানবাহিনীর ফায়ারপাওয়ার বা আঘাত হানার ক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে বাংলাদেশের প্রতিরোধ ব্যবস্থার এক নতুন শক্ত ভিত্তি স্থাপন করবে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সরবরাহ প্রক্রিয়া শেষ করে এসব সরঞ্জাম দ্রুতই জাতীয় প্রতিরক্ষা বহরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।
0 Comments