Header Ads Widget

Put AdSense Code Here

শিক্ষায় মাথাপিছু ব্যয়ে চরম বৈষম্য: আগামী দিনের আসল 'মেগা প্রকল্প' কোনটি?

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হলো আঞ্চলিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অবকাঠামোগত বৈষম্য। সম্প্রতি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের পেছনে সরকারের বার্ষিক ব্যয় সংক্রান্ত তথ্যে এই বৈষম্যের একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারের গড় বার্ষিক মাথাপিছু ব্যয় ২৮ হাজার ৮০০ টাকা। তবে ঐতিহ্যবাহী ও নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এই অংক আরও বেশি। উদাহরণস্বরূপ, বরিশাল জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের বার্ষিক মাথাপিছু ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৩০০ টাকায়। এই বৈষম্য কেবল শহর ও গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থার পার্থক্যকেই বাড়িয়ে দিচ্ছে না, বরং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

এই হিসাবটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দেশের হাতে গোনা কয়েকটি সরকারি ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি রাজ্য বা সরকারের বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক হলেও, গ্রামগঞ্জের কিংবা বেসরকারি এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেসরকারি ও পল্লী অঞ্চলের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ নিতান্তই সামান্য। সেখানে মাথাপিছু সরকারি বিনিয়োগের হার কয়েক হাজার টাকার বেশি নয়। ফলে শহরের নামকরা সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা যে ধরনের উন্নত অবকাঠামো, যোগ্য শিক্ষক এবং আধুনিক শিক্ষা সুবিধা পাচ্ছে, গ্রামের প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা তা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ বিভিন্ন অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল কিংবা নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের মতো বহুমাত্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও, শিক্ষা খাতকে একটি ‘মানবসম্পদ উন্নয়নের মেগা প্রকল্প’ হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, ইট-পাথরের ভৌত অবকাঠামো একটি দেশের বাহ্যিক উন্নয়ন নিশ্চিত করলেও, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি না হলে সেই উন্নয়নের সুফল দীর্ঘমেয়াদী হয় না। তাই দেশের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প হওয়া উচিত শিক্ষা খাতের আমূল সংস্কার ও সর্বজনীন সুষম বিনিয়োগ।

বরিশাল জিলা স্কুলের মতো শতবর্ষী ও সম্মানজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীপ্রতি ৩৩ হাজার ৩০০ টাকা ব্যয় হওয়াটা ইতিবাচক হলেও, সারা দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এই সুযোগ বিস্তৃত নয় কেন—সেই প্রশ্নটি এখন সময়ের দাবি। জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি বরাদ্দ পাওয়ায় এই স্কুলটির শিক্ষার মান ও ভৌত পরিবেশ ভালো থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে সকল বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, বিজ্ঞানাগার বা লাইব্রেরির সুবিধাসমূহ অনুপস্থিত, এখানকার শিক্ষার্থীরা কেন এই সুযোগের বৈষম্যের শিকার হবে? একই দেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিটি শিক্ষার্থীর সংবিধানে নিশ্চিত করা সমান মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে শিক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশেরও কম বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম। বাজেটের এই অপ্রতুলতার কারণেই শিক্ষায় অঞ্চলভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বৈষম্য প্রকট রূপ ধারণ করেছে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় সরকারি এবং বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ ও মানের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার এই বৈষম্য সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা উন্নত শিক্ষার সুযোগ না পেয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত সামান্য কিছু শহুরে শিক্ষার্থী ক্যারিয়ারে ভালো স্থানে পৌঁছাচ্ছে। ফলে সামাজিক বৈষম্যের চাকা ঘুরতে থাকে একই চক্রে। এটি সমাজে আয় বৈষম্য এবং নতুন শ্রেণির ব্যবধানকে আরও গভীর করে তুলছে। দেশ গঠনে তথ্যপ্রযুক্তি ও মেধার সুষম বণ্টন না ঘটলে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

সুতরাং, শিক্ষা খাতকে আগামী দিনের প্রধান মেগা প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করে জাতীয় বাজেটে এর বরাদ্দ বহুগুণ বাড়ানো এখন অপরিহার্য। বরিশাল জিলা স্কুল বা ঢাকার শীর্ষ বিদ্যালয়গুলোর মতো সারা দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে মাথাপিছু ব্যয়ের সমতা আনা প্রয়োজন। একই সাথে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার ল্যাব ও ডিজিটাল ক্লাসরুম গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করতে হবে। অবকাঠামোগত বড় প্রকল্পের পাশাপাশি যদি শিক্ষা নামক 'মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পে' রাষ্ট্র সঠিক গুরুত্ব দেয়, তবেই দেশের টেকসই ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

Post a Comment

0 Comments