
তিলোত্তমা কলকাতার হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত নিউমার্কেট এলাকা প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকের কোলাহলে মুখরিত থাকে। বিশেষ করে প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা পর্যটক, ব্যবসায়ী ও চিকিৎসা প্রত্যাশীদের কাছে মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট এবং সাডার স্ট্রিটের হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলো প্রধান আশ্রয়স্থল। কিন্তু এই জমজমাট পর্যটন এলাকার আড়ালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটুকু বজায় থাকছে, তা নিয়ে সম্প্রতি গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একাধিক ছোট-বড় দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ডের খবর এবং পুলিশের খাতায় ওঠা বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এখানকার বহু হোটেলই নিরাপত্তার ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ।
নিউমার্কেট অঞ্চলের আবাসন ও হোটেল শিল্পের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার চরম ঘাটতি। এই এলাকার বেশিরভাগ বাজেট হোটেল গড়ে উঠেছে বেশ পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী ভবনে। এখানকার গলিগুলো অত্যন্ত সংকীর্ণ, যেখানে কোনো জরুরি মুহূর্তে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। বহু হোটেলে জরুরি বহির্গমন পথ বা ইমার্জেন্সি এক্সিট নেই; আবার যেসব জায়গায় আছে, সেখানেও আসবাবপত্র বা অকেজো জিনিসপত্র রেখে পথ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তাছাড়া, অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক ওয়ারিং এই অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ ফায়ার সার্ভিস বিভাগের ছাড়পত্র বা এনওসি ছাড়াই বহু গেস্ট হাউস বছরের পর বছর বেআইনিভাবে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
পর্যটকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও নজরদারির ক্ষেত্রেও রয়েছে বিস্তর ফাঁকফোকর। আইন অনুযায়ী, প্রতিটি হোটেলে অবস্থানরত বিদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রে সঠিক পরিচয়পত্র যাচাই এবং 'সি-ফর্ম' পূরণ করে স্থানীয় থানায় জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় কিছু অসাধু হোটেল মালিক উপযুক্ত নথি ছাড়াই অতিথি তুলছেন। পাশাপাশি, অনেক বাজেট হোটেলে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা নেই, কিংবা থাকলেও সেগুলো অচল অবস্থায় পড়ে থাকে। ফলে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটলে জড়িতদের শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তালতলা ও নিউমার্কেট থানা পুলিশ মাঝে মাঝেই তল্লাশি অভিযান চালালেও স্থায়ী কোনো সমাধান আসছে না।
অবকাঠামোগত দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, নিউমার্কেটের অনেক হোটেলই মূলত শতবর্ষী জরাজীর্ণ ভবনের ছোট ছোট কক্ষকে রূপান্তর করে বানানো হয়েছে। নিয়মিত বিল্ডিং অডিট বা কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা না করার ফলে এই ভবনগুলো যে কোনো সময় বড় ধরনের প্রাকৃতিক বা মানবিক বিপর্যয়ে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার এখানকার অনেক কমদামি হোটেলেরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আন্তর্জাতিক পর্যটকেরা বাধ্য হয়ে এবং কম খরচের কথা ভেবে এসব সুবিধা মেনে নিচ্ছেন, যা সামগ্রিকভাবে কলকাতার পর্যটন শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
বাংলাদেশ থেকে আসা পর্যটকদের কাছে নিউমার্কেট এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সুবিধাজনক। কেনাকাটার সহজ সুযোগ, ঢাকা বা চট্টগ্রামগামী বাস কাউন্টারগুলোর কাছে হওয়া এবং চিকিৎসাসেবার জন্য বিভিন্ন ক্লিনিকে পৌঁছানোর সুবিধার কারণে ঝুঁকি জেনেও তারা এই অঞ্চলেই অবস্থান করেন। তবে নিরাপত্তার অভাবের সুযোগ নিয়ে সক্রিয় থাকে বেশ কিছু দালাল চক্র। প্রতারণা, লাগেজ চুরি বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় অনেক সাধারণ পর্যটককে। তথ্যকেন্দ্রে সঠিক নির্দেশনার অভাব তাদের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
প্রশাসনিক নজরদারি এবং কলকাতা পৌরসংস্থার ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক নাগরিক ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ। শুধুমাত্র বাণিজ্যিক লাইসেন্স দিলেই পৌরসভার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ফায়ার ব্রিগেড, পুলিশ এবং পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত বিরতিতে আকস্মিক পরিদর্শন অভিযান বা সেফটি অডিট চালানো প্রয়োজন। নিয়ম লঙ্ঘনকারী হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর জরিমানা, সাময়িক সিলগালা করা অথবা লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এই ধরনের গাফিলতি বন্ধ হবে না।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যটকদের নিজেদেরও সচেতন থাকা জরুরি। কোনো হোটেলে ওঠার আগে সেখানকার অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, আপদকালীন বের হওয়ার পথ এবং সিসিটিভি নজরদারি ঠিক আছে কিনা তা দেখে নেওয়া উচিত। সবসময় সরকারের অনুমোদিত বা স্বীকৃত হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলোতে অবস্থান করা নিরাপদ। কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ বা অনিয়ম চোখে পড়লে কালবিলম্ব না করে স্থানীয় থানা বা পর্যটন পুলিশের সহায় নেওয়া উচিত।
পরিশেষে, কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেট এলাকার হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি। পর্যটকদের জীবন সুরক্ষা নিশ্চিত না করতে পারলে কলকাতা শহরের এই প্রাণকেন্দ্রটি তার চিরচেনা আকর্ষণ ও বিদেশি পর্যটকদের আস্থা হারাতে পারে। সমন্বিত প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে নিউমার্কেটের হোটেলগুলোকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব করে তোলাই বর্তমান সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।
0 Comments