Header Ads Widget

Put AdSense Code Here

পদার্থবিজ্ঞানে ঐতিহাসিক সাফল্য: অর্ধশতকের অপেক্ষার পর সন্ধান মিলল অধরা 'গ্লুবল' কণার

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন
পদার্থবিজ্ঞানে ঐতিহাসিক সাফল্য: অর্ধশতকের অপেক্ষার পর সন্ধান মিলল অধরা 'গ্লুবল' কণার

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘ পাঁচ দশক বা ৫০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা ও অপেক্ষার পর অবশেষে বিজ্ঞানজগতে সাড়া ফেলে সন্ধান মিলেছে বহুপ্রতিক্ষিত ও অধরা 'গ্লুবল' (Glueball) কণার। পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল বা প্রমাণ কাঠামোর অন্যতম জটিল ধারণা 'কোয়ান্টাম ক্রোমোগতিবিদ্যা' (Quantum Chromodynamics বা QCD)-র পূর্বাভাসকে সত্য প্রমাণিত করে এই আবিষ্কার পারমাণবিক ও উপ-পারমাণবিক কণা গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

মহাবিশ্ব কী দিয়ে তৈরি—এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা পরমাণুর অভ্যন্তরে প্রোটন, নিউট্রন এবং তাদের গঠনকারী মৌলিক কণা 'কোয়ার্ক'-এর অস্তিত্ব উন্মোচন করেছিলেন। সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে, এই কোয়ার্কগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আটকে রাখে এক ধরনের শক্তিবাহী কণা, যাকে বলা হয় 'গ্লুঅন' (Gluon)। সাধারণ ভাষায় গ্লুঅন হলো সেই পারমাণবিক 'আঠা' যা বস্তুজগতের স্থায়িত্ব বজায় রাখে। তবে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মতে, গ্লুঅন কেবল কোয়ার্ককে যুক্তই করে না, তারা নিজেরাও একত্রিত হয়ে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কণা গঠন করতে পারে। আর এই বিশেষ গ্লুঅন-সংগঠিত কণাকেই নাম দেওয়া হয়েছে 'গ্লুবল'।

১৯৭০-এর দশকের সূচনাংশে যখন কোয়ান্টাম ক্রোমোগতিবিদ্যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়, তখনই বিজ্ঞানীরা তাত্ত্বিকভাবে দাবি করেছিলেন যে গ্লুবলের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। কিন্তু তাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশে যা অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল, পরীক্ষাগারে তা প্রমাণ করা ছিল অকল্পনীয় রকমের কঠিন। কারণ গ্লুবল কণা তৈরি হওয়ার পর অতি দ্রুত ভেঙে বা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অন্যান্য সাধারণ কণায় রূপান্তরিত হয়। এর ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব এবং অন্যান্য মেসন কণার সঙ্গে এর মিশ্রণের কারণে কণা ত্বরক যন্ত্রে (Particle Accelerator) একে সনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কণা ত্বরক কেন্দ্রগুলোতে বছরের পর বছর ধরে এই কণার চিহ্ন খোঁজা হচ্ছিল। সাম্প্রতিক উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন কণা সংঘর্ষের প্রাপ্ত বিশাল পরিমাণ তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এক বিশেষ শক্তির স্তরে এমন এক অবপারমাণবিক সংকেতের উপস্থিতি পেয়েছেন, যা শতভাগ গ্লুবলের তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়। বিশেষ করে উচ্চ-শক্তির কণা ক্ষয়ের সময় নিষ্ক্রান্ত সংকেত ও ভর বিশ্লেষণ করে এই অধরা কণার অস্তিত্ব সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

কেন এই আবিষ্কার এতটা গুরুত্বপূর্ণ? পদার্থবিজ্ঞানীদের মতে, গ্লুবলের সন্ধান পাওয়া কেবল একটি নতুন কণা আবিষ্কারের বিষয় নয়; বরং এটি প্রকৃতির মৌলিক বলগুলোর মধ্যে অন্যতম 'শক্তিশালী নিউক্লীয় বল' (Strong Nuclear Force)-কে অনুধাবন করার একটি মোড়ঘোরানো মুহূর্ত। যদি গ্লুবলের অস্তিত্ব নিখুঁতভাবে প্রমাণিত না হতো, তবে কোয়ান্টাম ক্রোমোগতিবিদ্যার মৌলিক তাত্ত্বিক কাঠামোতেই বড় ধরনের সংশোধনের প্রয়োজন পড়ত। এই আবিষ্কার প্রমাণ করল যে মহাবিশ্বের সূক্ষ্মতম কণাগুলো সম্পর্কে আমাদের বর্তমান গাণিতিক ও তাত্ত্বিক মডেলগুলো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।

এই সাফল্য বিশ্বজুড়ে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার কেবল অতীতের অর্ধশতকের পুরোনো তত্ত্বকে প্রমানই করে না, বরং ভবিষ্যতে ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তু এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদি মুহূর্তের 'কোয়ার্ক-গ্লুঅন প্লাজমা' অবস্থাকে গভীরভাবে বুঝতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

পাঁচ দশকের দীর্ঘ ও কঠিন বৈজ্ঞানিক যাত্রা পুনরায় প্রমাণ করল যে মানুষের অনুসন্ধান স্পৃহা ও বিজ্ঞানভাবনা অদম্য। বিজ্ঞানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হিগস বোসন বা 'ঈশ্বর কণা'র মতো গ্লুবলও দীর্ঘদিন ধরে কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার খাতায় সীমাবদ্ধ ছিল। অবশেষে ৫০ বছর পর গবেষণাগারের কঠোর বাস্তবতায় তার উপস্থিতি প্রমাণিত হলো। পারমাণবিক জগতের এই নতুন উন্মোচন ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞানের আরও অনেক জটিল ও অজানা রহস্যের সমাধান করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন বিজ্ঞানীরা।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

Post a Comment

0 Comments