Header Ads Widget

Put AdSense Code Here

মহাকাশে লাখ লাখ স্যাটেলাইট: বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট বিপ্লব নাকি ভবিষ্যতের ভয়াবহ মহাজাগতিক বিপর্যয়?

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন
মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে মানবজাতি আজ এক চরম যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং পৃথিবীর দুর্গম থেকে দুর্গমতম প্রান্তে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে মহাকাশে হাজার হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। তবে এই সুবিশাল প্রযুক্তির আড়ালে ঘনিয়ে আসছে এক চরম উদ্বেগজনক সংকট। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (Low Earth Orbit) লাখ লাখ স্যাটেলাইট পাঠানোর ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বিভিন্ন উন্নত দেশ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক স্যাটেলাইট মহাকাশে ভাসতে থাকলে তার চূড়ান্ত পরিণতি ঠিক কী হতে পারে?


বিগত কয়েক দশকে মহাকাশে প্রেরিত মোট কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। তবে মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের 'স্টারলিংক', আমাজনের 'কাইপার' কিংবা চিনের নিজস্ব মেগা-কনস্টেলেশন প্রকল্পের কারণে চিত্রটি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য হলো পৃথিবীর চারপাশে স্যাটেলাইটের এক বিশাল জাল তৈরি করা, যাতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে সর্বত্র এক নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপন করা যায়। বাণিজ্যিক এই প্রতিযোগিতার ফলে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। স্থান স্বল্পতার কারণে কক্ষপথে স্যাটেলাইটের চাপ দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই অনিয়ন্ত্রিত স্যাটেলাইট বিপ্লবের সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ হুমকি হলো 'স্পেস জাঙ্ক' বা মহাকাশের আবর্জনা। যখন কোনো স্যাটেলাইট তার মেয়াদ শেষ করে বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে পড়ে, তখন সেটি মহাকাশেই একটি ভাসমান ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, লাখ লাখ স্যাটেলাইটের উপস্থিতির কারণে মহাকাশে এগুলোর মধ্যকার সংঘর্ষের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে। এই ধরনের ছোট একটি সংঘাত থেকেও সৃষ্টি হতে পারে হাজার হাজার খুদে ধাতব টুকরো, যা বুলেটের চেয়েও দ্রুতগতিতে ঘুরতে থাকবে। এই প্রক্রিয়াটি একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা চেইন রিয়্যাকশন তৈরি করতে পারে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'কেসলার সিন্ড্রোম' (Kessler Syndrome)। এই পরিস্থিতি তৈরি হলে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে যে, ভবিষ্যতে সেখানে নতুন কোনো স্যাটেলাইট পাঠানো বা মহাকাশযান চালানো পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।

মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রেও এই মেগা-কনস্টেলেশনগুলো এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। লাখ লাখ স্যাটেলাইটের শরীর থেকে প্রতিফলিত সূর্যের আলো রাতের আকাশকে কৃত্রিমভাবে আলোকিত করে তুলছে, যাকে বলা হয় মহাজাগতিক 'আলোক দূষণ'। এর ফলে পৃথিবীর শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপের মাধ্যমে সুদূর ছায়াপথ, নক্ষত্র এবং পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা বিপজ্জনক গ্রহাণু পর্যবেক্ষণ করা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য চরম কঠিন হয়ে পড়েছে। টেলিস্কোপে তোলা ছবিতে স্যাটেলাইটের উজ্জ্বল রেখা বা 'স্ট্রিক' দৃশ্যমান হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ মহাজাগতিক ডেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে রাতের স্বাভাবিক ও পরিষ্কার মহাকাশ চিরতরে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবে।

মহাকাশ পরিবেশের পাশাপাশি পৃথিবীর নিজস্ব বায়ুমণ্ডলের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্যাটেলাইটের মেয়াদ শেষ হলে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করিয়ে পুড়িয়ে ফেলার নীতি অনুসরণ করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, হাজার হাজার স্যাটেলাইট বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ছাই হওয়ার সময় বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে বিপুল পরিমাণে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড জমা হয়। এই ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান পৃথিবীর সুরক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত 'ওজন স্তর' ক্ষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে প্রবেশ করে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

বর্তমানে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন ও মহাকাশ নীতিমালা এই সংকট মোকাবিলায় অনেকটাই অপ্রতুল। ১৯৬৭ সালে প্রণীত 'আউটার স্পেস ট্রিটি' ছিল তখনকার প্রেক্ষাপটে তৈরি, যা আজকের বাণিজ্যিক মেগা-কনস্টেলেশনের যুগকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। কক্ষপথে কোন দেশ বা সংস্থা কতটি স্যাটেলাইট পাঠাতে পারবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো আন্তর্জাতিক সীমা নির্ধারিত নেই। ফলে বাণিজ্যিক মুনাফা লাভের আশায় বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো সুদূরপ্রসারী পরিবেশগত পরিণতি চিন্তা না করেই মহাকাশ দখলের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে।

সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে, বিশ্বজোড়া হাই-স্পিড ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও অনিয়ন্ত্রিতভাবে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো মানবজাতির জন্য এক বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিজ্ঞানের এই অভূতপূর্ব অগ্রগতিকে ধরে রাখতে হলে অবিলম্বে একটি কঠোর আন্তর্জাতিক মহাকাশ ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ করা জরুরি। টেকসই স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, মহাকাশের আবর্জনা পরিষ্কারের কার্যকর ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সুনিশ্চিত করতে না পারলে, এই মহাজাগতিক বিপ্লব অচিরেই এক চরম বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

Post a Comment

0 Comments