জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র অভিঘাত এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে এশিয়ার অন্যতম উন্নত দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষি খাতে। নজিরবিহীন তাপদাহ ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য গ্যাংওন প্রদেশে আলুর ফলনে অভূতপূর্ব বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সাধারণ ধারণায় মাটির নিচে ফসল সুরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও, ভূগর্ভস্থ অস্বাভাবিক উত্তাপের কারণে ক্ষেতেই আলু নষ্ট হয়ে পচে যাচ্ছে এবং কার্যত ‘সেদ্ধ’ হয়ে যাওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর তথ্যানুযায়ী, গ্যাংওন প্রদেশের কৃষকেরা চলতি মৌসুমে ফসল তোলার প্রস্তুতি নিয়ে যখন আলুর ক্ষেত খুঁড়তে শুরু করেন, তখন তারা চরম হতভম্ব হয়ে পড়েন। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর আশা ছিল ভালো ফলনের, কিন্তু মাটি খুঁড়ে দেখা যায় অধিকাংশ আলুই আর খাওয়ার উপযোগী নেই। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে মাটির নিচেই ফসল অতিরিক্ত নরম, পচা ও ভাপানো আলুর মতো হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। অধিকাংশ কৃষক পুরো ক্ষেত ঘুরেও ঘরে তোলার মতো সামান্য পরিমাণ আলুও পাননি।
উল্লেখ্য, গ্যাংওন প্রদেশ ঐতিহ্যগতভাবেই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান আলু উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত। তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ার পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় সেখানকার আলু মানসম্মত ও সুস্বাদু হিসেবে সারা দেশে সমাদৃত। তবে চলতি বছরের নজিরবিহীন আবহাওয়া পরিস্থিতি পুরো চিত্র বদলে দিয়েছে। স্থানীয় প্রবীণ কৃষকরা জানান, তাদের জীবদ্দশায় তীব্র গরমের কারণে মাটির ভেতরের ফসল এভাবে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে তারা কখনো দেখেননি। বহু কৃষক এখন ব্যাংক ঋণ ও চরম আর্থিক অনটনের মুখে পড়েছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে শুধু বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা নয়, মাটির ভেতরের তাপমাত্রাও মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যরশ্মির বিকিরণ ও পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে মাটির আর্দ্রতা উবে গিয়ে মাটির নিচের অংশকে প্রায় ওভেনের মতো উত্তপ্ত করে তুলছে। ফলে কন্দজাতীয় ফসল মাটির নিচে প্রাকৃতিক সুরক্ষায় থাকা সত্ত্বেও রক্ষা পাচ্ছে না। পরিবেশবিদরা এই ঘটনাকে দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার কৃষি ব্যবস্থার জন্য এক বড় ধরনের বিপদের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।
এই আকস্মিক বিপর্যয়ের ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে আলুর ঘাটতি দেখা দেওয়ার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা সরকারের কাছে জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসনের জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে তাপসহনশীল নতুন জাতের বীজ উদ্ভাবন ও চাষাবাদ পদ্ধতিতে পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ কোরিয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, জলবায়ু বিপর্যয় এখন আর কোনো দূরবর্তী সংকট নয়, বরং তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি।
তথ্যসূত্র অনুসারে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

0 Comments