Header Ads Widget

Put AdSense Code Here

বৃষ্টি ছাড়াই নেপালে ‘মৃত্যুর ঢল’, জানা গেল নেপথ্যের ভয়ঙ্কর কারণ

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন


নেই কোনো ঝড়, নেই ভারী বৃষ্টিপাত। তবু কয়েক মিনিটের ভয়াবহ তাণ্ডবে নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলায় নেমে আসে মৃত্যুর মিছিল। পাহাড়ি জনপদ, নদীর তীরবর্তী এলাকা ও পর্যটন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। হঠাৎ নেমে আসা প্রবল পানি, বরফ, পাথর ও কাদার স্রোতে ব্যাপক প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—বৃষ্টি ছাড়াই কীভাবে সৃষ্টি হলো এমন ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা? কেন এই দুর্যোগের আগে কার্যকর কোনো সতর্কসংকেত পাওয়া যায়নি? আর পাহাড় থেকে নেমে আসা সেই স্রোত এত দ্রুত ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠল কীভাবে?




স্যাটেলাইট ছবি ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই বিপর্যয়ের পেছনে ভয়াবহ এক প্রাকৃতিক ঘটনার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তাদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হিমালয়ের উঁচু এলাকায় একটি বিশাল বরফ ও পাথরের অংশ ধসে পড়ার পর নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়। পরে সেই অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নিচের দিকে ভয়াবহ ঢল নেমে আসে।

ঘটনার শুরু প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায়

বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচু একটি পাহাড়ি এলাকায়। সেখানে থাকা হিমবাহ ও পার্শ্ববর্তী পাথুরে অংশের একটি বড় অংশ হঠাৎ ভেঙে নিচের দিকে ধসে পড়ে।

এই ধরনের ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ বা বরফ-পাথরের বিশাল ধস হিসেবে বর্ণনা করেন। বরফ, পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এলে তার শক্তি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ।

প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, বিশাল এই ধস পাহাড়ি উপত্যকায় নিচের দিকে নেমে গিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই পাহাড়ি এলাকায় তৈরি হয় অস্থায়ী একটি প্রাকৃতিক বাঁধ।

কিন্তু এই বাঁধ ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল।

উজান থেকে পানি জমতে থাকায় একপর্যায়ে পানির প্রচণ্ড চাপে সেই অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে যায়। এরপর বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদা একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে আসে।

কয়েক মিনিটেই ভয়াবহ রূপ নেয় পরিস্থিতি

পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এর গতি। সাধারণ নদীর বন্যার মতো পানি ধীরে ধীরে বাড়ে না। বরং পাহাড়ের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে নেমে এলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

রাসুয়া অঞ্চলের নদী ও উপত্যকার আশপাশে থাকা মানুষ এবং পর্যটকদের জন্য এই আকস্মিক স্রোত থেকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময় ছিল অত্যন্ত সীমিত।

বিজ্ঞানীদের মতে, এটি শুধু পানির স্রোত ছিল না। পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, মাটি, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ পানির সঙ্গে মিশে অত্যন্ত ঘন ও শক্তিশালী কাদার স্রোতে পরিণত হতে পারে।

এ ধরনের স্রোত অনেক সময় সাধারণ বন্যার পানির চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হয়। কারণ এর সঙ্গে ভেসে আসে বড় বড় পাথর, গাছ, মাটি ও অন্যান্য ভারী বস্তু। ফলে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও যানবাহন মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

ভূমিকম্প ছিল কারণ, নাকি ফলাফল?

দুর্যোগের শুরুতে ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথাও সামনে আসে। তবে পরবর্তী বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে নতুন একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

বিশাল বরফ ও পাথরের অংশ পাহাড় থেকে নিচে আছড়ে পড়লে মাটিতে শক্তিশালী কম্পন সৃষ্টি হতে পারে। অনেক সময় এমন ধসের ফলে উৎপন্ন ভূকম্পনকে দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় ভূমিকম্পের মতো শনাক্ত করা সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটির ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে—ভূমিকম্পের কারণে ধস হয়েছিল, নাকি বরং বিশাল ধসের আঘাত থেকেই ভূকম্পন তৈরি হয়েছিল।

স্যাটেলাইট তথ্য ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনাস্থলের দুর্গমতা এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হতে সময় লাগতে পারে।

কোনো বৃষ্টি না থাকায় কেন ছিল না আগাম সতর্কতা?

সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের পর আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে। আবহাওয়া দপ্তর বৃষ্টিপাতের তথ্যের ভিত্তিতে অনেক ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতাও দিতে পারে।

কিন্তু এই ঘটনায় বড় ধরনের বৃষ্টিপাতের অনুপস্থিতির কারণেই বিপদের পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হিমবাহ ধস, বরফ-পাথরের অ্যাভালাঞ্চ বা পাহাড়ি ঢালের আকস্মিক ভেঙে পড়া সব সময় প্রচলিত বন্যা সতর্কসংকেত ব্যবস্থায় ধরা পড়ে না। বিশেষ করে দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা থাকলে এমন দুর্যোগের পূর্বাভাস আরও কঠিন হয়ে যায়।

ফলে নিচের দিকে অবস্থানরত মানুষ ও পর্যটকদের জন্য বিপদ নেমে আসে প্রায় কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই।

এত পর্যটক সেখানে কেন ছিলেন?

নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। হিমালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ট্রেকিং রুট, পাহাড়ি নদী, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থান এবং অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক সেখানে যান।

ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় ভারতীয় পর্যটকদের উপস্থিতিও এসব অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি।

অনেক পর্যটক ট্রেকিং, পাহাড় ভ্রমণ এবং সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক এলাকা দেখতে সেখানে অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু আকস্মিক দুর্যোগের কারণে অনেকেই নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর সুযোগ পাননি।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কি সম্পর্ক রয়েছে?

এই ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নিয়েও গবেষণা চলছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বরফ গলছে, হিমবাহের গঠন পরিবর্তিত হচ্ছে এবং কিছু এলাকায় পাহাড়ি ঢাল ও বরফের নিচের অংশ দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন কতটা দায়ী, তা নির্ধারণের জন্য বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষকদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে হিমবাহ ধস, গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড এবং পাহাড়ি আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এখনো রয়েছে নতুন বিপদের আশঙ্কা

বিপর্যয়ের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ নয়। পাহাড়ি নদীর উজানে ধসে পড়া পাথর ও মাটির কারণে নতুন করে পানি আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

কোনো এলাকায় আবার অস্থায়ী বাঁধ তৈরি হলে এবং সেটি হঠাৎ ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে।

চলছে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান। নদীর ভাটির দিকসহ বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।

এই ভয়াবহ বিপর্যয় আবারও মনে করিয়ে দিল, হিমালয়ের মতো সংবেদনশীল পার্বত্য অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সব সময় শুধু বৃষ্টিপাত বা প্রচলিত আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে না।

কখনো কখনো পাহাড়ের অনেক ওপরে বরফ, পাথর বা হিমবাহের একটি বিশাল অংশের আকস্মিক ধস কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিচের জনপদে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

নেপালের এই ঘটনা তাই শুধু একটি আকস্মিক বন্যার গল্প নয়; এটি হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তিত পরিবেশ, হিমবাহের ঝুঁকি এবং ভবিষ্যতের দুর্যোগ সতর্কব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তারও একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা।

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

Post a Comment

0 Comments