Header Ads Widget

Put AdSense Code Here

সাকিবকে ছাড়িয়ে শীর্ষে মুশফিক আর এ টিভি নিউস

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

 অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দীর্ঘ ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে মাঠের লড়াইয়ে দুর্দান্ত শুরু পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রায় আড়াই দশক পর প্রোটিয়া কন্ডিশনের মতোই কঠিন ও গতিময় অস্ট্রেলিয়ান উইকেটে ফিরে আসা বাংলাদেশ দলের জন্য এই সফরটি ছিল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় লেখার সুযোগ। আর সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনেই ব্যক্তিগত অর্জনে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মুখ, অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিম। সতীর্থ ও প্রতিপক্ষ মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি ভিন্ন ক্রিকেটারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডে দেশসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে পেছনে ফেলেছেন মিস্টার ডিপেন্ডেবল খ্যাত এই উইকেটকিপার-ব্যাটার।

মুশফিকুর রহিম


দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসা মুশফিক বরাবরই পরিসংখ্যানের খাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়ে এসেছেন। তবে এবারের অর্জনটি একটু ভিন্ন ধরনের—এটি ব্যাট বা বল হাতে করা কোনো কীর্তি নয়, বরং দীর্ঘ ও ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এক অনন্য প্রতিফলন।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টে নামার আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০৭৩ জন ক্রিকেটারের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল উইকেটকিপার ব্যাটার মুশফিকের। এই টেস্টের প্রথম দিনে মাঠে নামার সাথে সাথে তার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৭৬ জনে। এর মধ্য দিয়ে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন সাকিবকে, যিনি এতদিন ১০৭৫ জন ক্রিকেটারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড নিয়ে তালিকার শীর্ষে ছিলেন।

মজার বিষয় হলো, এই দুই তারকা ক্রিকেটারের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র একজন প্রতিপক্ষ ক্রিকেটারের—অর্থাৎ দীর্ঘ ক্যারিয়ারজুড়ে হাজারেরও বেশি ভিন্ন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার পরও এতদিন প্রায় সমান অবস্থানেই ছিলেন সাকিব ও মুশফিক। তবে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার তিন নতুন মুখের বিপক্ষে খেলতে নামায় সেই ব্যবধান ভেঙে অবশেষে এককভাবে দেশের শীর্ষস্থানে উঠে আসেন মুশফিক।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাকিব ও মুশফিক—দুজনেই এমন দুই নাম, যাদের ক্যারিয়ার প্রায় সমান্তরালভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। দুজনই দুই হাজার শূন্য দশকের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত হয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের ক্রিকেটের নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন। ফলে এই দুই কিংবদন্তির মধ্যে পরিসংখ্যানগত এমন প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহের জন্ম দেয়। বিশেষ করে সাকিব বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অনেকটাই দূরে থাকায়, নিয়মিত মাঠে থাকা মুশফিকের পক্ষে এই ব্যবধান আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।

এই ম্যাচটিতে অস্ট্রেলিয়ার তিন ক্রিকেটার—জেক ওয়েদারাল্ড, ক্যামেরন গ্রিন ও বিউ ওয়েবস্টারের বিপক্ষে প্রথমবার মাঠে নামার সুযোগ পান ৩৯ বছর বয়সী মুশফিক। এমনকি তাসকিন আহমেদের করা ২২তম ওভারের শেষ বলে ক্যামেরন গ্রিনের ক্যাচটি লুফে নিয়ে নিজের এই রেকর্ড গড়ার দিনে মাঠে সরাসরি অবদানও রেখেছেন তিনি। উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে এমন গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ তালুবন্দি করা যেন প্রতীকীভাবেই বুঝিয়ে দেয়, মাঠের ভেতরে ও বাইরে উভয় জায়গাতেই কতটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন এই ক্রিকেটার।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মুশফিক তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেশের হয়ে অসংখ্য নতুন প্রতিপক্ষ ও নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। একদিকে যখন তার সমসাময়িক অনেক ক্রিকেটারই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছেন, তখনো মাঠে টিকে থেকে নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়াটাই তাকে এই বিরল কীর্তির মালিক বানিয়েছে।

শুধু দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নয়, এই কীর্তিতে এশিয়ান ব্যাটারদের মধ্যেও সবার শীর্ষে অবস্থান করছেন মুশফিকুর রহিম। তার এবং সাকিবের ঠিক পরেই তিন নম্বরে রয়েছেন ভারতীয় কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার, যিনি দুই যুগের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মোট ৯৮৯ জন ক্রিকেটারের সঙ্গে খেলেছেন। এশিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসে টেন্ডুলকারের মতো কিংবদন্তির চেয়েও এগিয়ে থাকাটা মুশফিকের এই অর্জনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে, কারণ টেন্ডুলকারও দীর্ঘ ২৪ বছরের ক্যারিয়ারে বিশ্বক্রিকেটের অসংখ্য প্রজন্মের ক্রিকেটারের বিপক্ষে খেলেছেন।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ভিন্ন ভিন্ন ক্রিকেটারের সঙ্গে খেলার সামগ্রিক বিশ্বরেকর্ডটি রয়েছে আয়ারল্যান্ডের টপ অর্ডার ব্যাটার পল স্টার্লিংয়ের দখলে। তিনি ১১০০-এর বেশি ক্রিকেটারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি থেকে আগেই অবসর নেয়া মুশফিক রয়েছেন দুই নম্বরে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়—স্টার্লিং এখনো তিন ফরম্যাটেই সক্রিয় থাকায় তার এই সংখ্যা প্রতি ম্যাচেই বাড়ছে, অন্যদিকে মুশফিক এখন কেবল টেস্ট ক্রিকেটেই সক্রিয় থাকায় তার এই তালিকায় ওঠা মূলত টেস্ট ম্যাচকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতার ফসল। এতে বোঝা যায়, দীর্ঘতম ফরম্যাটেও কতটা নিয়মিত ও দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি বজায় রেখেছেন এই অভিজ্ঞ ব্যাটার।

ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের রেকর্ড মূলত দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং বিভিন্ন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের বিপক্ষে টানা খেলে যাওয়ার প্রতিফলন। নতুন নতুন প্রতিপক্ষ দল উঠে আসা, পুরনো ক্রিকেটারদের অবসর নেওয়া এবং নতুনদের অভিষেক হওয়া—এই পুরো চক্রের মধ্য দিয়ে বছরের পর বছর টিকে থাকা একজন ক্রিকেটারের জন্য মোটেও সহজ কাজ নয়। মুশফিকের এই অর্জন তাই কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং তার দীর্ঘস্থায়ী ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতার সাক্ষ্যও বহন করে।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পথচলায় একের পর এক রেকর্ড নিজের নামের পাশে যোগ করছেন মুশফিক। অস্ট্রেলিয়ার এই সফরে তার সামনে অপেক্ষা করছে আরও একটি ঐতিহাসিক কীর্তি। এই টেস্ট সিরিজে আর মাত্র ১৯৪ রান করতে পারলেই তিনি হবেন বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার, যিনি টেস্ট ফরম্যাটে ৭ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করবেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এই কীর্তি কেউ গড়তে পারেননি, ফলে ডারউইন ও এর পরবর্তী টেস্টগুলো মুশফিকের জন্য হয়ে উঠতে পারে আরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়।

দলীয় বিবেচনায়ও এই সফরটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ ২৩ বছরের বিরতির পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামা বাংলাদেশ দলের জন্য অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের এমন পারফরম্যান্স ও উপস্থিতি তরুণ ক্রিকেটারদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে। মুশফিকের মতো একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের এমন ধারাবাহিক উপস্থিতি দলের মিডল অর্ডারে যে স্থিতিশীলতা এনে দেয়, তা কঠিন কন্ডিশনে খেলা এই সিরিজে বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ভরসার জায়গা হতে পারে।

ব্যাট হাতে মাঠে নামার আগেই এমন এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করায় মুশফিকুর রহিম প্রমাণ করলেন, বয়সের ছাপ কিংবা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় দেশের ক্রিকেটে তার অবদান ও প্রাসঙ্গিকতা কতটা সুদূরপ্রসারী। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বারবার প্রমাণিত এই নির্ভরযোগ্যতাই তাকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত করেছে, আর ডারউইনের এই রেকর্ড সেই দীর্ঘ পথচলার আরেকটি উজ্জ্বল সংযোজন হয়েই থাকবে।

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

Post a Comment

0 Comments