উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমানো প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্যই এক স্বপ্নের মাইলফলক। তবে কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন আর ভিসা পাওয়ার আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দাবি করে, তা হলো সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক কেবল টিউশন ফির ওপর নজর রাখলেও বাস্তবতা হলো, পড়ার খরচের বাইরেও বিদেশের মাটিতে জীবনযাত্রার একটি বড় অঙ্কের ব্যয় অপেক্ষা করে। সঠিক হিসাব-নিকাশের অভাবে শেষ মুহূর্তে অনেককেই পড়তে হয় চরম বিপাকে।
বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক টিউশন ফি মূল খরচের একটি অংশমাত্র। এর বাইরেও আবাসন, দৈনন্দিন খাবার, স্বাস্থ্যবীমা, স্থানীয় যাতায়াত এবং আনুষঙ্গিক খরচের একটি বড় খাত রয়েছে। বিভিন্ন দেশে বসবাসের খরচ ভিন্ন হওয়ায় আগে থেকেই সেই নির্দিষ্ট শহর বা অঞ্চলের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবীমা এবং প্রতি সেমিস্টারের বই বা পড়াশোনার সরঞ্জাম কেনার খরচ শুরুতেই খরচের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
আর্থিক পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পর্যবেক্ষণ। অনেক সময়ই শিক্ষার্থী বা অভিভাবকেরা একদম শেষ মুহূর্তে গিয়ে আন্তর্জাতিক কারেন্সি কেনেন বা ব্যাংকে টাকা ট্রান্সফার করেন। এতে এক্সচেঞ্জ রেটের হঠাৎ পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হতে পারে, যা বাজেটে বড় ধরনের টান ফেলে। তাই দেশ ছাড়ার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ধারাবাহিকভাবে মুদ্রা বিনিময় হার যাচাই করা এবং সুবিধাজনক সময়ে কারেন্সি কেনা বুদ্ধিমানের কাজ।
ভিসা আবেদনের সময় ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা পর্যাপ্ত আর্থিক প্রমাণের প্রয়োজন হয়। তবে শুধু ভিসার শর্ত পূরণের জন্য প্রদর্শিত অর্থই যথেষ্ট নয়; বিদেশের মাটিতে পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েক মাসের প্রাথমিক খরচের জন্য হাতে পর্যাপ্ত নগদ বা ইন্টারন্যাশনাল কার্ডের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। জার্মানির মতো অনেক দেশে 'ব্লকড অ্যাকাউন্ট' বা বিশেষ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখতে হয়, যেখান থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ তোলার সুযোগ থাকে। এই নিয়মকানুনগুলো সম্পর্কে শুরুতেই স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক।
পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম কাজ করে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর চিন্তা করেন অনেকেই। তবে সরকারি নিয়মকানুন ও কাজের সুযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশের মাটিতে পৌঁছানোর পরপরই খরচের জন্য কাজের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অন্তত প্রথম চার থেকে ছয় মাসের আবাসন ও দৈনন্দিন খরচ নিজের কাছে রাখা নিরাপদ। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন দেশে প্রচলিত যাতায়াত ও কেনাকাটার বিশেষ ছাড়ের সুবিধাগুলো কাজে লাগালে খরচ অনেকটাই কমে আসে।
পরিশেষে, বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে বাস্তবসম্মত বাজেট তৈরি করাই ঝামেলামুক্ত পড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করে। টিউশন ফির বাইরে সম্ভাব্য সব অদৃশ্য খরচকে হিসাবের মধ্যে এনে আগেভাগে প্রস্তুত থাকলে বিদেশের অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক সংকট এড়ানো সম্ভব। মানসিক চাপমুক্ত থেকে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে তাই সঠিক আর্থিক পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র অনুসারে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

0 Comments