Header Ads Widget

Put AdSense Code Here

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে প্রলয়ংকরী হিমবাহধস: ভোটেকোশি নদীতে রূদ্ররূপ, প্রাণহানি বেড়ে ৬২৩, নিখোঁজ সহস্রাধিক বিদেশি

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক হিমবাহধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় হিমালয় কন্যা নেপালে মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করেছে। পর্বতঘেরা ভোটেকোশি নদীর রুদ্ররূপে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া জনপদগুলোতে এখন শুধুই কান্নার রোল এবং ধসে পড়া অবকাঠামোর ধ্বংসস্তূপ। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও প্রতিনিয়ত উদ্ধার অভিযান চলার সাথে সাথে লাফিয়ে বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৩ জনে পৌঁছেছে। এর আগে নিহতের সংখ্যা ৫৮৬ জন বলা হলেও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আরও মৃতদেহ উদ্ধারের পর এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। বন্যা ও কাদা-পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৪৭৮ জন মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে অন্তত ৭৭৭ জন বিদেশি নাগরিকের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনা, যা এই দুর্যোগকে একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংকটে রূপ দিয়েছে।



ভোটেকোশি নদীতে প্রলয়ংকরী বন্যা ও তাণ্ডবলীলা

আরএটিভি নিউজের বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী অতি উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে একটি বিশাল আকৃতির হিমবাহ ভেঙে পড়ে এবং তার প্রভাবে পার্শ্ববর্তী হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ধসে বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর ও কাদা একসঙ্গে নিম্নাঞ্চলে ধেয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ী নদী ভোটেকোশি তার স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে এক দানবীয় প্লাবনে পরিণত হয়। নদীর দুপাশের লোকালয়, পর্যটন হোটেল, রিসোর্ট, ক্যাফে, হাইড্রো পাওয়ার প্রজেক্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রকাণ্ড পানির স্রোতে বিলীন হয়ে যায়। পার্বত্য জনপদ তালেজু, তাতোপানি ও সিন্ধুপালচোক এলাকার স্থানীয় অধিবাসীরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বন্যার তোড়ে ভেসে যান। নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোর রূপ এমনভাবে বদলে গেছে যে, সেখানে পূর্বে কোনো উন্নত লোকালয় ছিল তা চেনা দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

উদ্বেগ বাড়াচ্ছেন নিখোঁজ ৭৭৭ জন বিদেশি পর্যটক

সিন্ধুপালচোক জেলা প্রশাসন ও নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হিমালয়ের এই ট্রেকিং রুটটি বিদেশি পর্যটক, হাইকার ও পর্বতারোহীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। শরৎকালীন উপযুক্ত আবহাওয়ার কারণে অঞ্চলটিতে প্রচুর বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছিলেন। নিখোঁজ ২,৪৭৮ জনের তালিকায় ৭৭৭ জন বিদেশি নাগরিকের নাম উঠে আসায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, চীন এবং ভারতের নাগরিকরা এই ট্রেকিং রুটে অবস্থান করছিলেন। বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই তাদের হারিয়ে যাওয়া নাগরিকদের খোঁজে নেপাল সরকারের সাথে জরুরি কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। একাধিক রাষ্ট্র উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য নিজস্ব বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল ও উন্নত প্রযুক্তি পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

ব্যাহত উদ্ধার অভিযান ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

দুর্ঘটনাকবলিত দুর্গম পার্বত্য এলাকায় নেপাল সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বল (APF) এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দল দিনরাত এক করে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ভৌগোলিক দুর্গमता এবং প্রকৃতির প্রতিকূলতা উদ্ধারকাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপাল ও চীনের মধ্যকার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ঐতিহাসিক আর্নিকো হাইওয়ে ধসে পড়ায় এবং একাধিক বড় সেতু প্লাবনে ভেসে যাওয়ায় সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে অচল হয়ে পড়েছে। চরম খারাপ আবহাওয়া ও অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে বহু স্থানে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারছে না। ফলে দুর্গম পাহাড়ের খাদে বা কাদার নিচে আটকে পড়া মানুষদের কাছে দ্রুত পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সেনাসদস্যরা ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক স্থানে খালি হাতে কোদাল ও শাবল ব্যবহার করে পাথর সরানোর কাজ করছেন।

হুমকির মুখে অর্থনীতি ও হাইড্রো পাওয়ার খাত

এই প্রলয়ংকরী বিপর্যয় কেবল বিপুল প্রাণহানি ঘটায়নি, বরং নেপালের নাজুক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র ছিল এই ভোটেকোশি করিডোর। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ভোটেকোশি নদীর অববাহিকায় নির্মিত একাধিক হাইড্রো-ইলেকট্রিক প্রজেক্ট (জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র) বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে নেপালের জাতীয় পাওয়ার গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যা দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। স্থানীয় পর্যটন খাত, যা এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের রুটি-রুজির মূল ভিত্তি ছিল, তা পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যেতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট (GLOF)

আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এই প্রলয়ংকরী দুর্ঘটনাকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এক ভয়াবহ আলামত হিসেবে চিহ্নিত করছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে হিমালয়ের বরফখণ্ডগুলো আশঙ্কাজনকভাবে গলছে এবং দুর্বল বাঁধের জলধারা তৈরি করছে, যাকে পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় 'গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড' বা GLOF বলা হয়ে থাকে। হিমবাহ থেকে বিশালাকার বরফখণ্ড খসে পড়ার ফলে হ্রদের পানির চাপ অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং তা নিচের দিকে আকস্মিক প্লাবন তৈরি করে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এখন আর কোনো কাল্পনিক আশঙ্কা নয়, বরং পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনের জন্য এক নিত্যদিনের বাস্তব হুমকি।

আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ভবিষ্যৎ গতিপথ

পরিস্থিতির গভীরতা বিবেচনা করে নেপাল সরকার জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক রেডক্রস এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ত্রাণ সামগ্রী, সুপেয় পানি, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির উপকরণ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা শেষ হওয়ার পর বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষের পুনর্বাসন ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থ ও সময়ের প্রয়োজন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে থাকা নেপালের মতো দেশগুলোতে ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্যোগের প্রভাব কমাতে আধুনিক আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম বা আগাম সতর্কবার্তা প্রযুক্তি স্থাপন করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

নেপালের ভোটেকোশি নদীর ভয়াল তাণ্ডব ও হিমবাহধসের এই ঘটনা প্রকৃতির চরম প্রতিশোধেরই স্মারক। সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ ২৪৭৮ জন মানুষের জীবিত ফিরে আসার আশার প্রদীপ ততই নিভে আসছে। স্বজনহারাদের বুকফাটা আর্তনাদ এবং নিখোঁজদের খোঁজে হাহাকারে হিমালয়ের আকাশ-বাতাস এখন ভারী। বিশ্ব সম্প্রদায়কে এখনই ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের পাশে সর্বাত্মকভাবে দাঁড়াতে হবে এবং একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে পৃথিবীকে রক্ষায় বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।

ADVERTISEMENT / বিজ্ঞাপন

Post a Comment

0 Comments