
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বাজেট হোটেলে গভীর রাতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জন বাংলাদেশি নাগরিকের করুণ মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে চার বছরের এক নিষ্পাপ শিশুও রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। মধ্যরাতে আকস্মিক এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি কেবল কয়েকটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নিউ মার্কেট ও তৎসংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাজেট হোটেলগুলোর নাজুক পরিকাঠামো এবং অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটিকে আবারও জনসমক্ষে উন্মোচিত করে দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গভীর রাতে যখন হোটেলের আবাসিকরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, ঠিক তখনই ভবনটির একটি অংশ থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে এবং হোটেলটির সরু করিডোর ও সিঁড়িতে ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। বের হওয়ার উপযুক্ত কোনো জরুরি পথ বা বিকল্প অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকায় ঘরের ভেতর আটকে পড়েন বিদেশি অতিথিরা। ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এবং আগুনে দগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার বছরের শিশুসহ ৯ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ভেতরে আটকে পড়া অন্যান্যদের উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠায়।
কলকাতা শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এক গন্তব্য। প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিক উন্নত চিকিৎসা, কেনাকাটা, ব্যবসায়িক প্রয়োজন কিংবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কলকাতায় যাতায়াত করেন। বিশেষ করে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিট, মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এবং নিউ মার্কেট এলাকা বাংলাদেশি পর্যটকদের প্রধান আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এই এলাকাগুলোতে গড়ে উঠেছে শয়ে শয়ে কম খরচের বা বাজেট হোটেল ও গেস্ট হাউস। স্বল্প বাজেটে থাকার সুবিধা, বাংলাদেশ দূরপাল্লার বাসগুলোর কাউন্টার কাছে হওয়া এবং বাংলাদেশী খাবারের সহজলভ্যতার কারণে অধিকাংশ ভ্রমণকারীই এই এলাকাটি বেছে নেন। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে এক মারাত্মক বিপদ, যা এই অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে আরও একবার প্রমাণিত হলো।
কলকাতার এই সাশ্রয়ী হোটেলগুলোর বেশিরভাগই তৈরি হয়েছে বহু বছরের পুরোনো, জরাজীর্ণ আবাসিক ভবন সংস্কার করে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, বহুতল এসব ভবনে কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা বা 'ফায়ার এনওসি' (No Objection Certificate) নেই। অত্যন্ত সরু সিঁড়ি, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের অভাব, কৃত্রিম কাঠের পার্টিশন দিয়ে ছোট ছোট ঘর তৈরি এবং অত্যন্ত নিম্নমানের বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং—এসবই এখানকার হোটেলগুলোর সাধারণ চিত্র। কোনো কারণে একবার আগুন লাগলে সরু গলি ও বহুতলের ভেতরের সংকীর্ণ করিডোর ভেদ করে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের উদ্ধারকাজ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। জরুরি মুহূর্তে বহিরাগমনের (Emergency Exit) পথ না থাকা যেন এই হোটেলগুলোর জন্য এক সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতার ঐতিহ্যবাহী এলাকার এই লজিং বা গেস্ট হাউসগুলোতে নিয়মিত সরকারি পরিদর্শন বা ফায়ার সেফটি অডিট হয় না বললেই চলে। প্রশাসনিক নজরদারির চরম শিথিলতার সুযোগ নিয়ে অনেক হোটেল মালিকই স্বল্প খরচে সর্বোচ্চ মুনাফা লাভের আশায় অগ্নিনিরাপত্তা আইনকে চরমভাবে উপেক্ষা করে আসছেন। প্রতিটি ঘরে বা করিডোরে কার্যকর ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র (Smoke Detector), অটোমেটিক স্প্রিংকলার সিস্টেম বা পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (Fire Extinguisher) থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার দেখা মেলে না। এ ছাড়া হোটেলের কর্মচারীদের কোনো ধরনের আপৎকালীন ফায়ার ড্রিল বা জরুরি উদ্ধারকাজের প্রশিক্ষণ থাকে না, যার মাশুল দিতে হলো নিরপরাধ বাংলাদেশি পর্যটকদের।
এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি ভারতের পর্যটন খাত এবং বাংলাদেশ থেকে আসা চিকিৎসার্থীদের নিরাপত্তার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন একে দিয়েছে। যেসব বাংলাদেশি নাগরিক কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করে ভারতে যান, তাদের জীবন এভাবে প্রশাসনিক গাফিলতি ও হোটেল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে বিপন্ন হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে আসা এই অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং স্থানীয় সরকারের আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যেও পড়ে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কলকাতার পুরসভা (KMC) এবং রাজ্য ফায়ার সার্ভিস বিভাগকে অবিলম্বে শহরের সমস্ত বাজেট হোটেলে কঠোর চিরুনি অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং নিয়ম অমান্যকারী হোটেলগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
একই সাথে, বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় ভ্রমণে যাওয়া নাগরিকদেরও আবাসন নির্বাচনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সচেতনতা অবলম্বন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র কম খরচ বিবেচনা না করে, হোটেলে অবস্থান করার আগে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে বের হওয়ার পথ রয়েছে কিনা, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সচল আছে কিনা এবং ঘরগুলোতে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা আছে কিনা তা দেখে নেওয়া উচিত। এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে, নিরাপত্তার ব্যয় সাময়িক মনে হলেও অবহেলার মাশুল দিতে হয় অমূল্য জীবন দিয়ে। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠছে সর্বস্তরে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।
0 Comments